দেওয়ানি কার্যবিধির দুটি বিধি না মেনে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ অবৈধ: হাইকোর্ট
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০১-১১-২০২৬ ১২:১০:০১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০১-১১-২০২৬ ১২:১০:০১ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
রায় ঘোষণার আগে দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ ও ৬ বিধির বাধ্যতামূলক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই অর্থঋণ আদালতে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা এক রিট মামলায় ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ সম্প্রতি এ রায় দেন। রায়ে আদালত অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকের করা সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন মঞ্জুর করে দেওয়া আগের আদেশকে বেআইনি ও বাতিল ঘোষণা করেছেন।
মামলার প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই
মামলার বিবরণে জানা যায়, বর্তমান প্রতিপক্ষ ব্যাংক (রিট মামলার ২ নম্বর রেসপন্ডেন্ট) বাদী হয়ে তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীসহ ৮ জন বিবাদীর বিরুদ্ধে ১৪৮ কোটি ১৯ লাখ ২ হাজার ৮১০ টাকা ৪২ পয়সা দাবি করে প্রথমে অর্থঋণ মামলা নং ৩৩৭/২০২৫ (যা পরবর্তীতে স্থানান্তরিত হয়ে অর্থঋণ আদালত-৫, ঢাকায় অর্থঋণ মামলা নং ৩৪৩/২০২৫ হিসেবে পুনর্নম্বরকৃত হয়) দায়ের করে। ওই মামলায় বিবাদীপক্ষ লিখিত জবাব দাখিল করার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ বিধি এবং ১৫১ ধারা অনুযায়ী রায় ঘোষণার আগে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্রোকের দুটি আবেদন দাখিল করে। পরবর্তীতে অর্থঋণ আদালত কোনো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই গত বছরের ১৮ নভেম্বর ক্রোকের আবেদনটি মঞ্জুর করেন।
আদালতের এ আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে বিবাদীদের একজন হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নং ২৪৯৮/২০২৬ দায়ের করেন। আদালত প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল নিশি জারি করেন এবং আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া ও রিভিউ আবেদনের পর মামলাটি চূড়ান্ত শুনানির জন্য হাইকোর্ট বেঞ্চে ওঠে।
আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক
রিট পিটিশনারের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন আইনজীবী তাইসির হক। শুনানিতে তিনি যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, ট্রায়াল কোর্ট (অর্থঋণ আদালত) দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ বিধিতে বর্ণিত বিধানগুলো মোটেও অনুসরণ করেননি। রুল ৫(১)-এর অনুচ্ছেদ (ক) ও (খ)-তে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট আশঙ্কার বিষয়টি হলফনামা বা প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করার কথা থাকলেও ব্যাংক তার আবেদনে তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া, সম্পত্তি ক্রোকের আগে বিবাদীকে সম্পত্তির প্রাক্কলিত মূল্যের বিপরীতে জামানত দাখিল করতে বা কেন জামানত দেওয়া হবে না, তার কারণ দর্শানোর জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার যে বাধ্যতামূলক আইনি বিধান রয়েছে, আদালত তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন।
অন্যদিকে, ব্যাংক তথা ২ নম্বর বিবাদীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মারগুব কবির। সঙ্গে ছিলেন তাইসির মাহমুদ। তারা রিট আবেদনটি খারিজ করার দাবি জানান। যুক্তি দেখান, ব্যাংক তাদের ক্রোকের আবেদনের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে সম্পত্তি হস্তান্তরের আশঙ্কার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। এ ছাড়া, বিবাদী পিতা ও পুত্র যোগসাজশে ব্যাংকঋণ এড়ানোর জন্য নিজেদের সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন এবং তারা ঋণখেলাপি হওয়ায় ট্রায়াল কোর্টের দেওয়া ক্রোকের আদেশ সম্পূর্ণ আইনানুগ ও সঠিক হয়েছে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত
উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি ও নথি পর্যালোচনার পর হাইকোর্ট বিভাগ কঠোর পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ ও ৬ বিধি হুবহু উদ্ধৃত করে জানান, আদালতের সন্তুষ্টি এবং বিবাদীকে আইনি সুযোগ দেওয়ার বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে শুধু ভাসা-ভাসা যুক্তিতে কোনো ট্রায়াল কোর্ট এমন আদেশ দিতে পারেন না।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন:
“দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ ও ৬ বিধির স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী, আদালত প্রথমে বিবাদীকে সম্পত্তির মূল্য বা সমপরিমাণ জামানত দিতে অথবা কেন জামানত দেওয়া হবে না, তার কারণ দর্শাতে নির্দেশ দেবেন। এই দুই বিকল্প পালনে ব্যর্থ হলেই কেবল আদালত ক্রোকের আদেশ দিতে পারেন।”
আদালত আরও বলেন, অর্থঋণ আদালতের বিচারক দেওয়ানি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট বিধিগুলো বা ব্যাংকের ক্রোকের আবেদনটি ভালোভাবে পর্যালোচনা না করেই অত্যন্ত ঢিলেঢালা ও অযৌক্তিকভাবে আদেশটি দিয়েছেন, যা আইনের দৃষ্টিতে টেকসই নয়।
পরিশেষে, আদালত রুলটি চূড়ান্ত (অ্যাবসলিউট) ঘোষণা করেন এবং অর্থঋণ আদালতের ক্রোকের আদেশটির বৈধতা খারিজ করে দেন। তবে আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক উপযুক্ত মনে করলে পুনরায় নতুন করে আবেদন করতে পারবে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স